ছিফাত রহমান সনম
পাবনাতে এক ব্যাতিক্রমী অদ্ভুদ চরিত্রের মানুষ সাংবাদিক এস এম আলম। সাদা পোশাকেই পারে করে দিলেন জীবন তিনি। হোয়াইট আলম নামে সমধিক পরিচিত গোটা জেলায়। বন্ধুরা অনেক সময়ে দুষ্টুমী করে তাকে ডাকেন বিধবা আলম বলেও। ব্যাক্তিগত জীবনে সজ্জন সদালাপী এ মানুষটিকে দিনভর শহরজুড়ে নানা আয়োজনের খবর সংগ্রহে ব্যস্ত দেখলেও, সন্ধ্যার পরে চোখে পড়েনা কারো,কারন এটি ছিলো মায়ের আদেশ। এস এম আলমের প্রতিদিন শুরু হয় পাবনার আরিফপুর সদর গোরস্থানে স্বজনদের কবর জিয়ারত ও এতিমদের সাথে সকালের নাস্তা দিয়ে। এভাবেই কেটে যাচ্ছে ব্যাক্তিগত জীবনে অবিবাহিত সাংবাদিক হোয়াইট আলমের জীবনধারা। সর্বমহলে পরিচিতমুখ হোয়াইট আলম। পেশায় সাংবাদিক। শহরের গেপালপুর মহল্লার ইমব্যাংকমেন্ট রোডোর মরহুম আহম্মদ ছেলে ৫৫ বছর বয়সী এই হোয়াইট আলম সাংবাদিকতার সাথে জড়িয়ে আছেন ৩৫ বছর। ৮৯ সালে পিতাকে হারানোর পরে ২০১৩ সালে মারা যান তার মা সালেহা বেগম। ৪ ভাই ও ২ বোনের মাঝে মারা গেছেন এক ভাই। হোয়াইট আলম বাংলা টিভির পাবনা জেলা প্রতিনিধি ও অনলাইন নতুন চোখ পত্রিকার প্রকাশক। এছাড়াও দেশবার্তা নামের একটি পত্রিকাতে কাজ করেন তিনি। জেলা প্রশাসন, রাজনৈতিক কর্মসূচিসহ নানা আয়োজনের ছবি তুলে তিনি তা মেলে ধরেন স্থানীয় পত্রিকাগুলোতে। শহরের এলএমবি মার্কেটে আলম ষ্টুডিও নামের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে তার। স্থানীয়ভাবে শাপলা ক্লাব নামের একটি ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। চল্লিশ বছর ধরে তিনি সাদা পোশাক পড়েন। তার নাকি খুবই ভালো লাগে সাদা রঙ। একারনে চল্লিশ বছর আগে শুরু করেছিলেন আজো তিনি সাদাতেই আছেন। দিনভর নানা আয়োজন অনুষ্ঠানে তাকে দেখা গেলেও সন্ধ্যার পরে কারো চোখে পড়েনা হোয়াইট আলমকে। এর কারন হিসেবে তিনি জানান, সন্ধ্যার পরে বাইরে থাকার কারনে মা তাকে কান ধরে উঠবস করাতো। মায়ের আদেশ ছিলো সন্ধ্যার পরে যেনো বাড়ির বাইরে না থাকি। একারনে প্রায় চল্লিশ বছর আগে এই অভ্যাস শুরু করেছিলাম। এখন মা নেই, কিন্তু তার আদেশ এখনও ধারন করছি বলে জানান তিনি। কথা বলতে বলতে তিনি বলেন, সকলকে ভালো সহি শুদ্ধ জীবনে শামিল থাকতে হবে। ভালো কাজ করতে হবে। আর সকলকে মিথ্যা কথা ছাড়তে হবে। তিনি দৈনিক ইছামতিকে ধন্যবাদ জানান তার মতো একজন সাধারন মানুষকে তুলে ধরার জন্য। ২০০৪ সালে মারা যান হোয়াইট আলমের বড় দুলাভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রকৌশলী হাশেম পারভেজ ছোট ছোট তিন ছেলে মেয়ে রেখে মারা যান। মৃত্যুর পূর্বে বলে গিয়েছিলেন আলম সারাজীবন সততার জন্য কিছু করতে পারিনি ভাই, তুই আমার এই নাবালক সন্তানদের দেখিস। এরপরে তিন ভাগ্নে ভাগ্নি উম্মে কাওসার সুরভী, আরাফাত বাবর ও মেজবাহ উদ্দিন শাহিনকে নিজের সন্তানের মতো মানুষ করেন মামা হোয়াইট আলম। ২০১৮ সালে মারা যায় তার ভাগ্নি সুরভী। বড় বোনসহ পিতা হারানো তিন নাবালক ভাগ্নে ভাগ্নিকে নিয়েই যেনো পরিবার হয়ে ওঠে আলমের।

হোয়াইট আলমের ভাগ্নে আরাফাত বাবর বলেন, আলম মামা তার দায়িত্ববোধ ও দায়বদ্ধতা নিয়ে তাদেরকে বড় করেছেন। কখনো ভাবেননি তার নিজের কথা। তার ভাগ্নে বল্লেন মামা তো এতিমদের খুবই ভালোবাসেন। আমরাও তো এতিম, মামা হয়তো সকল এতিমের মাঝে আমাদেরকে খুঁজে পান। সে তার সবটুকু চেষ্টা ঢেলে দিয়েছেন যাতে করে আমরা ভালো থাকি। এক কথায় সে একজন আলাদা মানুষ আমাদের কাছে। আলমের ছোটো বোন সঙ্গীত শিল্পী নাসিমা আশরাফ জানান, একরকম শিশু সুলভ মানুষ আলম ভাই। কখনো পরিবারের দায়িত্বের বাইরে যাননি তিনি। মায়ের আদর্শ ও শাসন যেনো অজো তাড়া করে তাকে। মায়ের বারণ ছিলো সন্ধ্যার পরে বাইরে না থাকা, এজন্য পাবনা শহরটি সন্ধ্যার পরে কেমন দেখা যায়, এটা বলতে পারবে না আলম ভাই। হয়তো খুবই জরুরী হলে বছরে একদিন বের হয় এমন। সে শুধু সাদা পোশাকই পড়ে না, সে একজন সাদা মনের মানুষ। তার মনটা খুবই ভালো। আমাকে ছোটোবেলা থেকে অনুষ্ঠানে হাত ধরে নিয়ে গেছেন। গান শিখতে উৎসাহিত করেছেন। তার কারনেই আজকে আমি একজন শিল্পী হিসেবে পরিচিত হয়েছি। আলম ভাইয়ের জন্য দোয়া করবেন সকলে। আরিফপুর সদর গোরস্থান মসজিদ ও এতিমখানার মুহাতাম ও ইমাম ফরিদুর ইষরাম বলেন, প্রতিদিন সকালে ফজর নামাজ পড়ে আরিফপুর সদর গোরস্থানে চলে যান হোয়াইট আলম। সেখানে কবর জিয়ারত করে সকালের নাস্তা সারেন সেখানকার মসজিদ সংলগ্ন এতিমদের সাথে। তাদেরকে পড়ালেখাতে উদ্বুদ্দ করেন। তাদের প্লেটে প্লেটে কখনো কখনো নিজ হাতে তুলে দেন খাবার। এখানকার এতিমখানাতে গ্যাসের সংযোগ স্থাপন, টিউবওয়েল স্থাপনসহ নানা কাজে এতিমদের একজন যেনো বন্ধু এই হোয়াইট আলম। সে আসলে এতিম শিশুরা হয় আনন্দিত। গোরস্থানের খাদেমদের সাথে কথা বলেন, খোঁজখবর রাখেন তাদের সমস্যার। এরকারনে এখানকার সকলেও ভালোবাসেন হোয়াইট আলমকে। গণমাধ্যমে কাজ করা আলমের ঘনিষ্ট বন্ধুদের মাঝে পাবনা প্রেসক্লাবের সাবেক সম্পাদক আঁিখনূর ইসলাম রেমন বলেন, আশির দশকে যে ছেলেটা সরকারীভাবে কাজ করতো গণমাধ্যমে। তথ্য মন্ত্রনালয়ের নানা ধরনের ডকুমেন্টরী তৈরিতে ভূমিকা রাখতো, দেশের অসংখ্য মানুষ তাকে চেনে। সেই আলম চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে আসে। পরিবারের প্রতি অসামান্য অবদান রাখার দায়বদ্ধতা ও দায়িত্ববোধ থেকে তার পথচলা। নিজের কথা কখনো ভাবেনি সে। শুধুই যেনো পরিবারের সদস্যদের জন্যই এরকম হয়ে গেছে তার জীবন। বিয়েসাদী করলো না। তার মুখে সব সময়ে হাসি। কিন্তু এই হাসির মাঝে যে গোপন ব্যথা লুকিয়ে আছে,তা জানেনা অনেকেই। তার দুলাভাই মারা যাবার পরে বড় বোন ও তার তিন সন্তানের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছে সে। কোনো মামা যে তার ভাগ্নে ভাগ্নির জন্য এমন দায়িত্ব পালন করতে পারে নিজের জীবনের সবটুকু চেষ্টা ঢেলে দিয়ে, এখনকার দিনে আলম সেই জায়গা থেকে বিরল একটা ভূমিকা পালন করছে। সদালাপী পাবনার হোয়াইট আলম বলেছেন, সকলকে ভালো কাজ করতে হবে। মানুষের উপকার করতে হবে। আর মিথ্যা কথা বাদ দিতে হবে। মিথ্যা কথা বাদ দিলেই অনেক অন্যায় থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। আমরাও সকলে মিথ্যা পরিত্যাগ করবো এবং পারলে পাশের মানুষদের উপকারে কাজে লাগবো। আর দাায়িত্ববোধ ও দায়বদ্ধতা দিয়ে যত্ন রাখবো পরিবারের সদস্যদের প্রতি।
