যুক্তরাষ্ট্রের আলটিমেটাম উপেক্ষা করে হরমুজ প্রণালির কাছে একটি বাণিজ্যিক কার্গো জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইরান। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (IRGC) ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে ইরানের বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে নতুন করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এক্সিওস-এর সাংবাদিক বারাক রাভিদের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানিয়েছে, শনিবার (১১ জুলাই) সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিট (ইটি) থেকে হামলা শুরু হয়। সাইপ্রাসের পতাকাবাহী কনটেইনার জাহাজটিতে আগুন ধরে যায় এবং ইঞ্জিন কক্ষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ঘটনায় একজন বেসামরিক নাবিক নিখোঁজ রয়েছেন। চলতি সপ্তাহে এটি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় দফার সামরিক অভিযান।মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এই পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে ইরান-মার্কিন স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (MoU) আরও সংকটের মুখে পড়েছে। একই দিনে হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা নিরসনে আঞ্চলিক কূটনৈতিক আলোচনা শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নতুন এই সংঘর্ষ শুরু হয়।
শুক্রবার (১০ জুলাই) ইরানকে শনিবার (১১ জুলাই) পর্যন্ত সময় দেয় ট্রাম্প প্রশাসন। হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখা এবং বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধ করার ঘোষণা দিতে ইরানকে এই আল্টিমেটাম দেওয়া হয়। এই সময়ের মধ্যে ইরানকে প্রকাশ্যে এ ঘোষণা দেওয়ার দাবি জানায় যুক্তরাষ্ট্র। তবে, এর পরিবর্তে একটি বাণিজ্যিক কার্গো জাহাজে হামলা চালায় আইআরজিসি। একই সঙ্গে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়।এর জবাবে ইরানের আকাশ ও সমুদ্র নজরদারি রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের গুদাম, উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র (SAM) ব্যবস্থা লক্ষ্য করে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ইরান ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন তাদের এর মূল্য দিতে হবে।অন্যদিকে আইআরজিসি দাবি করেছে, কয়েকটি জাহাজকে অনুমোদনহীন নৌপথ ব্যবহার না করার সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল। কার্গো জাহাজটি গতিপথ পরিবর্তন না করায় তারা সতর্কতামূলক গুলি ছোড়ে।আইআরজিসি ঘোষণা দেয়, যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে। কোনো জাহাজকে এই পথ দিয়ে চলাচল করতে দেওয়া হবে না।
এদিকে কূটনৈতিক সূত্র জানায়, শনিবার (১১ জুলাই) মাস্কাটে অনুষ্ঠিত আলোচনায় ওমান হরমুজ প্রণালির উভয় নৌপথ পুরোপুরি পুনরায় খুলে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাব অনুযায়ী, ওমানের জলসীমা দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলীয় নৌপথে পূর্বানুমতি ছাড়াই জাহাজ চলাচলের সুযোগ ফিরিয়ে আনার কথা ছিল।তবে সূত্রের দাবি, মাস্কাটের এ প্রস্তাবের অনুমোদন দেয়নি ইরানের প্রতিনিধিদল। বিষয়টি আরও অভ্যন্তরীণ আলোচনার জন্য তেহরানে নিয়ে গেছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, আইআরজিসি যে কার্গো জাহাজে হামলা চালিয়েছে, সেটি ওই দক্ষিণাঞ্চলীয় নৌপথ দিয়েই চলাচল করছিল।প্রসঙ্গত, জেনেভা শহরে আলোচনা চলা অবস্থায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালায় মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথবাহিনী। এতে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন। এর প্রতিবাদে ৩৯ দিনে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ১০০ দফা হামলা চালায় ইরান।
এরপর ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবের ভিত্তিতে গত ৭ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেন ট্রাম্প। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় এবং ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে সরাসরি বৈঠক করেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা। আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়া ১৩ এপ্রিল হরমুজে নৌ-অবরোধ আরোপ করা হয়। এরপর কয়েক দফা যুদ্ধবিরতির সময় বাড়ান ট্রাম্প।সর্বশেষ, ইরানের ১৪ দফা শর্তের ভিত্তিতে চলতি সপ্তাহে একটি সমঝোতা স্মারক নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছায় দুই পক্ষ। অ্যাক্সিওস এর সংবাদের তথ্য মতে, ১৪ দফার ভিত্তিতে দুই পক্ষ ৬০ দিনের জন্য আলোচনায় সম্মত হয়েছে এবং ইরানের ওপর হামলা তথা যুদ্ধ বন্ধের বিনিময়ে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হয়েছে।ইরানের লিগ্যাল মেডিসিন সংস্থার তথ্যমতে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত সংঘাতে মোট ৩ হাজার ৩৭৫ জন নিহত হন, যার মধ্যে ২ হাজার ৮৭৫ জন পুরুষ এবং ৪৯৬ জন নারী। এছাড়া জরুরি চিকিৎসা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধে ১১৮ জন চিকিৎসাকর্মী আহত হন এবং ২৬ জন নিহত হন।
সুত্র: আক্সিওস রিপোর্ট
