শ্বাসরুদ্ধকর একটি ম্যাচ। শুরু থেকে তুমুল মারামারি। কেউ কাউকে বিন্দু পরিমাণ ছাড় দেবে না- এমন মানসিকতা নিয়েই খেলা শুরু করেছিল। একের পর এক হার্ড ট্যাকল, ফাউল- ম্যাচটা যেন ফুটবল খেলার চেয়ে রেসলিং খেলায় পরিণত হয়েছিল। আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড সেমিফাইনালের পুরো প্রথমার্ধকে স্রেফ এভাবেই বর্ণনা করা যায়।দ্বিতীয়ার্ধের ১০ম মিনিটে (৫৫তম মিনিটে) গোল করে এগিয়ে গিয়েছিল ইংল্যান্ড। ৮৫ মিনিট পর্যন্ত ১-০ গোলে এগিয়ে ইংল্যান্ড। আর্জেন্টিনার বিদায় নিশ্চিত ধরে নিয়েছিল অনেকেই। কারণ, ইংল্যান্ড তো আর কেপ ভার্দে কিংবা মিশর নয় যে শেষ মুহূর্তে ম্যাচ বের করে নেবে আর্জেন্টাইনরা।কিন্তু ফুটবলে শেষ এক মিনিটেও অনেক কিছু বদলে যেতে পারে। লিওনেল মেসিদের ম্যাচের চিত্র বদলে দিতে সময় লেগেছে ঠিক ৭ মিনিট। ৮৫তম মিনিটে মেসির জাদুকরি এক অ্যাসিস্ট। বুলেট গতির শটে গোল করলেন এনজো ফার্নান্দেজ। এরপর ৯০+২ মিনিটে আসলে সেই ম্যাজিকাল মুহূর্ত। মেসির আরও একটি জাদুকরি ক্রস।এবার ডানপ্রান্ত থেকে বল ভেসে এলো বাম কোনের পোস্টে। সেখানে ছিলেন লাউতারো মার্টিনেজ। দারুণ এক হেডে তিনি বল জড়িয়ে দিলেন ইংল্যান্ডের জালে।২-১ ব্যবধান তৈরি হয়ে গেলো। এরপর ইনজুরি সময়ের বাকি অংশটা ইংল্যান্ড চেষ্টা করেছিল সমতায় ফেরার; কিন্তু লাভ হলো না। ২-১ ব্যবধানে ইংল্যান্ডকে হারিয়েই টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে গেলো আর্জেন্টিনা।আটলান্টার গর্জনমুখর মার্সিডিজ বেঞ্জ স্টেডিয়ামে দ্বিতীয়ার্ধের ৫৫ মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে এগিয়ে গিয়েছিল ইংল্যান্ড। কিন্তু শেষ মুহূর্তে লিওনেল মেসির দুটি দুর্দান্ত অ্যাসিস্টে প্রথমে এনজো ফার্নান্দেজ এবং পরে বদলি লাউতারো মার্তিনেজ গোল করে ইংল্যান্ডের স্বপ্ন ভেঙে দেন।রোববার নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠেয় ফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা।
গোলশূন্য প্রথমার্ধের পর ম্যাচে গতি আসে দ্বিতীয়ার্ধে। ৫৫ মিনিটে হ্যারি কেইনের আক্রমণ প্রতিহত করলেও বল যায় ডেকলান রাইসের কাছে। রাইস দ্রুত বল তুলে দেন মরগান রজার্সের পায়ে। অ্যাস্টন ভিলার মিডফিল্ডারের নিখুঁত ক্রসে ডিফেন্ডার নাহুয়েল মোলিনাকে ফাঁকি দিয়ে গোল করেন অ্যান্থনি গর্ডন।প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মূল একাদশে সুযোগ পেয়ে অ্যাসিস্ট করেন রজার্স। অন্যদিকে চলতি বিশ্বকাপে গর্ডনের এটি দ্বিতীয় গোল।গোল হজমের পর বদলি খেলোয়াড় নামিয়ে আক্রমণের ধার বাড়ান কোচ লিওনেল স্কালোনি। নিকো গঞ্জালেস, রদ্রিগো ডি পল, নিকোলাস ওতামেন্দি, গঞ্জালো মন্তিয়েল এবং পরে লাউতারো মার্তিনেজকে মাঠে নামান তিনি।৬৯ মিনিটে মেসির নিখুঁত ক্রস থেকে নিকো গঞ্জালেসের হেড অসাধারণ দক্ষতায় ফিরিয়ে দেন জর্ডান পিকফোর্ড। ৭৬ মিনিটে ডি পলের ক্রসে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের হেড পোস্টে লেগে ফিরে আসে। পরের মিনিটেই গঞ্জালেসের আরেকটি হেড অল্পের জন্য বাইরে চলে যায়। ইংল্যান্ড তখন পুরোপুরি রক্ষণে ব্যস্ত।৭২ মিনিটে গোলদাতা গর্ডনকে তুলে এজরি কনসাকে নামিয়ে পাঁচ ডিফেন্ডারের কৌশল নেন ইংল্যান্ড কোচ টমাস টুখেল। পরে ড্যান বার্ন ও নিকো ও’রাইলিকেও মাঠে নামিয়ে রক্ষণ আরও ভারী করেন তিনি।
এই সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। রক্ষণে গুটিয়ে যাওয়ায় পুরো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় আর্জেন্টিনার হাতে।৮৫ মিনিটে ম্যাচে ফেরান অধিনায়ক লিওনেল মেসি। দূর থেকে এনজো ফার্নান্দেজের শট দুর্দান্তভাবে কর্নারের বিনিময়ে ফিরিয়ে দেন পিকফোর্ড। সেই কর্নারের ধারাবাহিক আক্রমণে বল আবারও মেসির কাছে আসে। আর্জেন্টাইন অধিনায়ক নিখুঁতভাবে বল বাড়িয়ে দেন ফার্নান্দেজকে। প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে নেওয়া দুর্দান্ত এক বাঁকানো শটে পিকফোর্ডকে পরাস্ত করে ম্যাচে সমতা ফেরান চেলসি মিডফিল্ডার।এই অ্যাসিস্টের মাধ্যমে টানা ১১টি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল কিংবা অ্যাসিস্ট করার বিরল রেকর্ড গড়েন মেসি।
সমতায় ফেরার পরও থামেনি আর্জেন্টিনা। নির্ধারিত সময় শেষে যোগ করা ৯ মিনিটের দ্বিতীয় মিনিটে আসে ম্যাচের নিষ্পত্তি। ম্যাক অ্যালিস্টারের দূরপাল্লার শট প্রতিহত হওয়ার পর বল যায় মেসির কাছে। মুহূর্তের মধ্যে তিনি বক্সে ভাসিয়ে দেন দারুণ এক চিপ পাস। সেখানে দৌড়ে এসে শক্তিশালী হেডে পিকফোর্ডকে পরাস্ত করেন বদলি লাউতারো মার্তিনেজ।গোলটি ইংল্যান্ডের হৃদয় ভেঙে দেয়। ইন্টার মিলানের এই স্ট্রাইকার সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষেও অতিরিক্ত সময়ে গোল করেছিলেন। এবারও বদলি নেমে দলকে ফাইনালের টিকিট এনে দিলেন।গোল হজমের পর মরিয়া হয়ে ইভান টনি ও মার্কাস রাশফোর্ডকে নামান টমাস টুখেল। তবে আর্জেন্টিনার সংগঠিত রক্ষণ ভাঙতে পারেনি থ্রি লায়ন্সরা। শেষ বাঁশি বাজতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে আর্জেন্টাইন শিবির। আর হতাশায় ভেঙে পড়ে ইংল্যান্ড।
এর আগে কিক অফের বাঁশি বাজার পর প্রথমার্ধজুড়ে আলোচনায় ছিল একের পর এক শক্ত ট্যাকল, উত্তেজনা, হলুদ কার্ড এবং লিওনেল মেসিকে ঘিরে ইংল্যান্ডের কড়া মার্কিং।খেলা শুরুর পর থেকেই দুই দল শারীরিক লড়াইয়ে নেমে পড়ে। মাত্র দ্বিতীয় মিনিটেই জুদ বেলিংহ্যামকে ট্যাকল করে ফাউল করেন লিয়ান্দ্রো পারেদেস। এরপর মেসি, বেলিংহ্যাম, অ্যান্ডারসন ও এনজো ফার্নান্দেজকে ঘিরে মাঝমাঠে কয়েকবার উত্তেজনা তৈরি হয়।প্রথম ১০ মিনিটেই আর্জেন্টিনা চারটি ফাউল করে, যা চলতি বিশ্বকাপে কোনো দলের প্রথম ১০ মিনিটে যৌথভাবে সর্বোচ্চ ফাউলের রেকর্ড।প্রথমার্ধের বড় একটি সময় দুই দলই একে অপরকে আটকে রাখে মাঝমাঠে। ২০ মিনিট পেরিয়ে গেলেও কোনো দলই উল্লেখযোগ্য শট নিতে পারেনি।ইংল্যান্ড কিছুটা বেশি সংগঠিত ফুটবল খেললেও হ্যারি কেইন কার্যত ম্যাচের বাইরে ছিলেন। প্রথম ২৮ মিনিটে ইংলিশ অধিনায়কের বল স্পর্শের সংখ্যা ছিল মাত্র চারটি, যা মাঠের সব খেলোয়াড়ের মধ্যে সবচেয়ে কম।
ইংল্যান্ডের মিডফিল্ডার এলিয়ট অ্যান্ডারসন পুরো প্রথমার্ধে মেসিকে ছায়ার মতো অনুসরণ করেন। কয়েকবার বল কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি শক্ত ট্যাকলও করেন তিনি।৩৭ মিনিটে মেসি ড্রিবল করে কয়েকজনকে কাটিয়ে এগোতেই অ্যান্ডারসনের করা ট্যাকলে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। সঙ্গে সঙ্গে দুই দলের খেলোয়াড়রা রেফারিকে ঘিরে ধরেন। কিছুক্ষণ উত্তেজনা চললেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন রেফারি ইসমাইল এলফাথ। এই ফাউলের জন্য ম্যাচের প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন অ্যান্ডারসন।৩২ মিনিটে জুদ বেলিংহ্যামের দুর্দান্ত দৌড়ে পাওয়া ফ্রি-কিক থেকে ইংল্যান্ড প্রায় এগিয়েই গিয়েছিল। ডেকলান রাইসের দারুণ ভাসানো বলে জন স্টোনস লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে পরাস্ত করে হেড করেন। তবে বল জালের পাশ ঘেঁষে বাইরে চলে যায়।অন্যদিকে ৩৯ মিনিটে আর্জেন্টিনার সেরা সুযোগ আসে মেসির বুদ্ধিদীপ্ত ফ্রি-কিক থেকে। ছোট পাসে খেলা শুরু করে পারেদেসের কাছ থেকে বল ফেরত পান মেসি। তার শট হ্যারি কেইনের গায়ে লেগে ফিরে আসে এনজো ফার্নান্দেজের কাছে। দূরপাল্লার জোরালো শটে গোলের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যান তিনি, কিন্তু বল অল্পের জন্য পোস্টের ওপর দিয়ে বাইরে চলে যায়।
৪২ মিনিটে পাল্টা আক্রমণে উঠতে থাকা মর্গান রজার্সকে টেনে থামিয়ে দেন লিসান্দ্রো মার্তিনেজ। এতে ম্যাচে আর্জেন্টিনার প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে হলুদ কার্ড দেখেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এই ডিফেন্ডার।প্রথমার্ধে গোল না হলেও উত্তেজনার কোনো কমতি ছিল না। দুই দলই রক্ষণে ছিল দারুণ শৃঙ্খলাবদ্ধ, তবে আক্রমণে শেষ মুহূর্তের ধারালো স্পর্শের অভাব ছিল স্পষ্ট। রেফারি তিন মিনিট অতিরিক্ত সময় যোগ করলেও সেই সময়েও গোলের দেখা মেলেনি। ফলে বিরতিতে গোলশূন্য সমতায় মাঠ ছাড়ে দুই বিশ্বশক্তি।এই জয়ে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠল আর্জেন্টিনা। অন্য সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে আগেই ফাইনাল নিশ্চিত করেছে স্পেন।এখন ফুটবল বিশ্বের চোখ নিউ জার্সির দিকে। যেখানে শিরোপার লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী দল স্পেন। সবশেষে আবারও প্রমাণ করলেন লিওনেল মেসি- বড় মঞ্চে তিনিই এখনো আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় ভরসা।
