ফ্যাসিস্ট সরকার পতনের যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর মধ্যে মতভিন্নতা থাকতে পারে, তবে কোনো বিভেদ নেই বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, ৩১ দফা ও জুলাই সনদের আলোকে সবাই মিলে দেশকে এগিয়ে নেওয়া হবে।সোমবার (২০ জুলাই) সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর নেতাদের সম্মানে আয়োজিত নৈশভোজের আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে আছি, একসঙ্গে ছিলাম, ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতেও একসঙ্গে থাকবো। আমাদের মধ্যে ডিফারেন্স অব ওপিনিয়ন (মতভিন্নতা) হতে পারে, কিন্তু ভুল বোঝাবুঝির কোনো কারণ আছে বলে মনে করি না। ৩১ দফার মাধ্যমে আমরা একটি জায়গায় একত্রিত হয়েছি। আমাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য এক।’
‘৩১ দফার কোনো একটি দফা কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে আপনার একটি মত থাকতে পারে, আমার একটি মত থাকতে পারে। এখানেই কিছুটা ভিন্নতা থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই। ৩১ দফা ও জুলাই সনদের আলোকে আমরা দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবো,’ যোগ করেন তিনি।অতীতের আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে অনেকেই দাবি করে, কারও নাম উল্লেখ করতে চাই না, একটি শব্দ ‘গুপ্ত’ ব্যবহার করলেই সাধারণ মানুষও তাদের চিনে। আন্দোলনের সময় আমরা অনেক খুঁজেছি, কিন্তু তাদের পাইনি। আপনারা কি রাজপথে তাদের দেখেছিলেন? বিভিন্ন সময়ে তাদের দেখেছি, যারা দেশ থেকে পালিয়ে গেছে, তাদের সঙ্গে। শেষের দিকে কিছু জায়গায় দেখেছি। কিন্তু ১৭ বছর বিভিন্ন জায়গায় তাদের দেখিনি।’
তিনি বলেন, ‘এ কারণেই দেশের মানুষ যুগপৎ আন্দোলনের নেতৃত্বের ওপর আস্থা রেখেছে এবং বিশ্বাস করেছে, তারাই দেশকে এগিয়ে নিতে পারবে।’দেশের মানুষের আস্থা ধরে রাখতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘জনগণ প্রত্যাশা নিয়ে দায়িত্ব দিয়েছে। তাই আগে সেই দায়িত্ব পালন করতে হবে, পরে নিজেদের কথা ভাবা যাবে।এর আগে বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর সবাই একসঙ্গে হয়েছেন। আন্দোলন-সংগ্রামের সময় সবাই নির্যাতিত হয়েছেন। আল্লাহর রহমতে বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সফল হয়েছেন এবং ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে বিজয় অর্জন করেছেন। জনগণ আমাদের দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘অনেক রাজনৈতিক দল মিলে রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছিল। তখন অন্য অনেক রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি, যারা পরে সংস্কারের কথা বলেছেন, তাদের সংস্কারের ‘স’ বলতেও দেখা যায়নি। অথচ স্বৈরাচারের চোখরাঙানি উপেক্ষা করে তখনকার যুগপৎ জোটই রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছিল।’তারেক রহমান জানান, তার বিশ্বাস, নির্বাচনে জনগণ ৩১ দফার পক্ষেই রায় দিয়েছে। এখন এটি শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর নয়, বরং বাংলাদেশের জনগণের ৩১ দফা হয়ে গেছে। ১২ তারিখের নির্বাচনে সবাই একসঙ্গে কাজ করেছেন এবং সফল হয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘৫ আগস্ট স্বৈরাচার বিদায় হওয়ার পর একটি ‘গুপ্তবাহিনী’ ধীরে ধীরে আত্মপ্রকাশ করে। নির্বাচনের আগে ও নির্বাচনের সময় তারা ডিজিটাল মাধ্যমে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে। তবে বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের সুযোগ পেলে সব সময় দেশের পক্ষে সঠিক সিদ্ধান্তই নেয় এবং ১২ তারিখের নির্বাচনেও সেটিই করেছে।’বক্তব্যে অন্তর্বর্তী সরকারের এক উপদেষ্টার সঙ্গে নিজের কথোপকথনের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, কয়েক দিন আগে ওই উপদেষ্টা তাকে বলেছেন, ১৮ মাস দেশ পরিচালনার সময় তারা খুব অসহায়ের মতো ছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারের ৬০ শতাংশের বেশি জায়গায় সেই ‘গুপ্তবাহিনীর’ প্রভাব ছিল।প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই উপদেষ্টার বক্তব্য অনুযায়ী, নির্বাচনের পর জনগণের রায়ের কারণে তারা দিশাহারা হয়ে গেছে এবং বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য দিচ্ছে, যা সংবাদপত্র ও সামাজিক মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে।বক্তব্যে ফ্যাসিস্ট সরকারের ১৬ থেকে ১৭ বছরে রেখে যাওয়া বিধ্বস্ত অর্থনীতি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎব্যবস্থা, শিক্ষা, যোগাযোগ ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে এসব সংকট মোকাবিলার কথাও বলেন।প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এত দিন একসঙ্গে ছিলাম। কে আমাদের সরিয়ে দেবে? আমরা একসঙ্গেই থাকবো। চলতে গেলে এদিক-ওদিক হতেই পারে। এই দেশে অনেক সমস্যা। ঢাকা শহর পরিষ্কার করতেই সমস্যা। যেদিকে তাকাবেন, ময়লা।’তিনি বলেন, কেউ একজন জানতে চেয়েছিলেন, এটি ফেয়ারওয়েল ডিনার কি না। তার ভাষায়, ‘ফেয়ারওয়েল ডিনার যদি দিতে হয়, গুপ্ত-সুপ্তদের দিতে পারি, স্বৈরাচারকে দিতে পারি। কিন্তু আমরা যারা ছিলাম, আমরা ইনশাআল্লাহ একসঙ্গে থাকবো।’শরিক নেতাদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, অনেক দিন একসঙ্গে বসার সুযোগ হয়নি বলেই এই আয়োজন করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, প্রবীণ নেতাদের মনের কষ্টের কথা তিনি জানেন। বয়সে তারা বড়, তাই ছোট ভাই হিসেবে তাদের সব কথা মেনে নেন এবং এ জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন।তিনি সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে বলেন, জনগণের প্রত্যাশা অনেক। তাই আগে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বক্তব্য দেন জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মুফতি মহিউদ্দিন ইকরাম।এর আগে তারেক রহমান সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে যমুনায় পৌঁছে শরিক দলগুলোর নেতাদের টেবিলে টেবিলে গিয়ে কুশল বিনিময় করেন এবং তাদের খোঁজখবর নেন। পরে তাদের সঙ্গে নৈশভোজে অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়।অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, দলের সহ-সভাপতি বরকত উল্লাহ বুলু, মোহাম্মদ শাহজাহান, আবদুল আউয়াল মিন্টুসহ অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রী বুফে থেকে খাবার নিয়ে শরিক নেতাদের সঙ্গে একই টেবিলে বসেন। ওই টেবিলে ছিলেন নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) মোস্তফা জামাল হায়দার, বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থ, বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, গণফোরামের সুব্রত চৌধুরী এবং ভাসানী জনশক্তি পার্টির শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু।
