বার্সেলোনার রক্ষণভাগে দীর্ঘদিনের ভরসার নাম ছিলেন রোনাল্ড আরাউহো। সময়ের সঙ্গে সেই জায়গাটা কিছুটা নড়বড়ে হয়েছে। এবার ক্যারিয়ারকে নতুন করে সাজানোর লক্ষ্যেই স্প্যানিশ ক্লাবটি ছেড়ে ইংলিশ ফুটবলে পাড়ি জমালেন উরুগুইয়ান ডিফেন্ডার। মৌসুমের বাকি সময়ের জন্য নয়, পুরো এক মৌসুমের ধার চুক্তিতে তাকে দলে টেনেছে লিভারপুল। চুক্তিতে আছে স্থায়ীভাবে তাকে কিনে নেওয়ার সুযোগও।ইএসপিএনের সূত্র অনুযায়ী, আরাউহোকে এক মৌসুমের জন্য ধারে নিতে লিভারপুলকে কোনো লোন ফি দিতে হয়নি। তবে আগামী গ্রীষ্মে প্রায় ৫৫ মিলিয়ন ইউরোতে তাকে স্থায়ীভাবে দলে নেওয়ার সুযোগ থাকবে ইংলিশ ক্লাবটির। চলতি মৌসুমে আরাউহোর পুরো বেতন বহন করবে লিভারপুল। অ্যানফিল্ডে আসার পথ সহজ করতে অবশ্য নিজের বেতনও কিছুটা কমিয়েছেন ২৭ বছর বয়সী এই ডিফেন্ডার।বার্সেলোনার হয়ে প্রাক্-মৌসুমের অনুশীলনও করেছিলেন আরাউহো। তবে ক্লাবটিতে গত দুই মৌসুমে নিজের জায়গা ধরে রাখতে পারেননি তিনি। সেই পরিস্থিতিতে নতুন চ্যালেঞ্জের খোঁজে ছিলেন উরুগুইয়ান তারকা। লিভারপুলও রক্ষণভাগে অভিজ্ঞ ও একাধিক পজিশনে খেলতে সক্ষম একজন খেলোয়াড় খুঁজছিল। দুই পক্ষের প্রয়োজন মিলে যাওয়ায় দ্রুতই চূড়ান্ত হয় চুক্তি।
লিভারপুলের নতুন কোচ আন্দোনি ইরাওলা রক্ষণভাগকে আরও শক্তিশালী করতে চাচ্ছেন। চোটের কারণে জো গোমেজ, জিওভানি লিওনি ও জেরেমি জাকে এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নন। এর মধ্যে ইব্রাহিমা কোনাতেও ফ্রি ট্রান্সফারে রিয়াল মাদ্রিদে চলে গেছেন। ফলে অধিনায়ক ভিরগিল ফন ডাইকের সঙ্গে রক্ষণে আরও একজন অভিজ্ঞ বিকল্প প্রয়োজন ছিল লিভারপুলের। সেই জায়গাটিই পূরণ করবেন আরাউহো।লিভারপুলের জার্সিতে আরাউহোকে দেখা যাবে ৩৩ নম্বর পরে। অ্যানফিল্ডে যোগ দেওয়ার পর নিজের উচ্ছ্বাসও প্রকাশ করেছেন তিনি, ‘আমি শুরু করার জন্য আর অপেক্ষা করতে পারছি না। আমি খুব, খুব খুশি। এত ইতিহাসসমৃদ্ধ বিশাল একটি ক্লাবে আসতে পেরে আমি রোমাঞ্চিত। সতীর্থদের সঙ্গে দেখা করার জন্য, খেলা শুরু করার জন্য মুখিয়ে আছি। আমি খুবই অনুপ্রাণিত এবং মাঠে নামার জন্য প্রস্তুত।’
বার্সেলোনার প্রতি সম্মান রেখেই নতুন ক্লাবে আসাকে নিজের ক্যারিয়ারের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন আরাউহো। তিনি বলেন, ‘ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে আমার জন্য এটাই আদর্শ পদক্ষেপ। আমার মনে হয়, এই পরিবর্তনটা প্রয়োজন ছিল। লিভারপুলের আগ্রহের কথা শোনার পর সবকিছু খুব দ্রুত এগিয়েছে। আমি এখানে আসতে পেরে সত্যিই আনন্দিত।’২০১৮ সালে উরুগুয়ের ক্লাব বস্টন রিভার থেকে বার্সেলোনার রিজার্ভ দলে যোগ দিয়েছিলেন আরাউহো। এরপর ধীরে ধীরে মূল দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে ওঠেন। এখন পর্যন্ত কাতালান ক্লাবটির হয়ে ২১৩টি ম্যাচ খেলেছেন তিনি।বিশেষ করে ২০২২-২৩ মৌসুমে জাভি হার্নান্দেজের অধীনে বার্সেলোনার লা লিগা জয়ের পথে আরাউহোর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আন্দ্রেয়াস ক্রিস্টেনসেনের সঙ্গে রক্ষণভাগের কেন্দ্রে জুটি গড়ে দলকে শিরোপা জেতাতে বড় অবদান রাখেন তিনি। একসময় ক্লাবের নেতৃত্বের গ্রুপেও জায়গা করে নিয়েছিলেন।
কিন্তু ২০২৪ সালে হান্সি ফ্লিক বার্সেলোনার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। চোট, ফর্মের ওঠানামা এবং ব্যক্তিগত কিছু সমস্যার কারণে মূল একাদশে নিয়মিত জায়গা হারান আরাউহো। গত মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে মাত্র ১৬ ম্যাচে শুরু থেকে খেলতে পেরেছিলেন তিনি। পাও কুবারসি, এরিক গার্সিয়া ও জেরার্ড মার্টিনের মতো ডিফেন্ডারদের অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন ফ্লিক।শুধু ফর্মের সমস্যাই নয়, চোটও বারবার থামিয়েছে তাকে। ২০২৪-২৫ মৌসুমের শুরুতে হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটে চারমাস মাঠের বাইরে ছিলেন। এরপর গত মৌসুমে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার সমস্যার কারণেও প্রায় দুই মাস দলের বাইরে ছিলেন তিনি। এসব কারণে বার্সেলোনায় নিজের পুরোনো জায়গা ফিরে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।লিভারপুলের জন্য আরাউহোর বড় সুবিধা হলো তার বহুমুখিতা। মূলত সেন্টার-ব্যাক হলেও প্রয়োজন হলে রাইট-ব্যাক হিসেবেও খেলতে পারেন তিনি। বার্সেলোনায় এমন ভূমিকায় তাকে দেখা গেছে। বিশেষ করে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে এল ক্লাসিকোয় ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে সামলাতে তাকে রাইট-ব্যাক হিসেবে খেলিয়েছিল কাতালান ক্লাবটি।
তার শারীরিক সক্ষমতাও লিভারপুলের রক্ষণে বাড়তি শক্তি যোগ করতে পারে। প্রায় ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি উচ্চতার আরাউহো আকাশে বল মোকাবিলা, শারীরিক দ্বৈরথ এবং দ্রুতগতির আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের সামলাতে কার্যকর। ডিফেন্সের পাশাপাশি ডান প্রান্তেও তার উপস্থিতি লিভারপুলের বিকল্প বাড়াবে।উরুগুয়ের জাতীয় দলের হয়েও ২৭ ম্যাচ খেলেছেন আরাউহো। এবারের বিশ্বকাপেও মার্সেলো বিয়েলসার দলে ছিলেন তিনি। তবে বিশ্বকাপের মূল পর্বে একটি ম্যাচেও মাঠে নামার সুযোগ পাননি। উরুগুয়ে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়।লিভারপুলে যোগ দিয়ে এখন আরাউহোর সামনে নতুন করে নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ। বার্সেলোনায় হারিয়ে যাওয়া জায়গা পুনরুদ্ধারের বদলে এবার ইংলিশ ফুটবলে নিজের সামর্থ্য দেখাতে হবে তাকে। আর যদি অ্যানফিল্ডে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করতে পারেন, আগামী মৌসুমে ৫৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে স্থায়ীভাবেই লিভারপুলের খেলোয়াড় হয়ে যেতে পারেন তিনি।
তবে আরাউহোকে নিয়েই লিভারপুলের এবারের দলবদলের ব্যস্ততা শেষ হচ্ছে না। সূত্রের বরাত দিয়ে ইএসপিএন জানিয়েছে, ক্লাবটি এখনো ট্রান্সফার মার্কেটে সক্রিয়। বিশেষ করে একজন উইড ফরোয়ার্ড দলে নেওয়াই তাদের অগ্রাধিকার। পিএসজির ব্র্যাডলি বারকোলা ও ইব্রাহিম এমবায়ে রয়েছেন লিভারপুলের সম্ভাব্য লক্ষ্যগুলোর তালিকায়।অর্থাৎ রক্ষণে আরাউহোকে এনে আপাতত একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি পূরণ করেছে লিভারপুল। এবার আক্রমণভাগেও নতুন মুখ এনে দলটিকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করার পরিকল্পনা ইরাওলার।
